প্রসঙ্গ গ্রামবার্তাঃ
কুমারখালী বার্তা

মাহমুদ হাফিজ

কুমারখালীর কৃতিসন্তান সাহিত্যিক-সাংবাদিক কাঙাল হরিনাথ মজুমদার  ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’ প্রকাশ করেছিলেন ১৮৫৭ সালে। এ সময় হাতে লিখে কাঙাল হরিনাথ গ্রামবার্তা প্রকাশিকা প্রকাশ করতে থাকেন। পরে তা মুদ্রিত হতো কলকাতার গিরিশচন্দ্র বিদ্যারত্ন প্রেস থেকে। প্রথমে মাসিক আকারে প্রকাশিত হতো। পরে তা পাক্ষিক ও সাপ্তাহিক আকারে প্রকাশিত হয়। সাহিত্যিক অক্ষয় কুমার মৈত্রে’র পিতা কাঙাল-সুহৃদ মথুরনাথ মৈত্র ১৮৬৪ সালে কুমারখালীতে মথুরানাথ মুদ্রাযন্ত্র (এম এন প্রেস) স্থাপন করেন। পরে ১৮৭৬ সাল থেকে কাঙাল কুমারখালী থেকেই ছেপে পত্রিকাটি প্রকাশ শুরু করেন। টানা ২৪ বছর এর প্রকাশনা অব্যাহত রেখেছিল জানা যায়।
১৮৩৩ সালে কুমারখালীতে জন্ম নেয়া কাঙালের সাংবাদিকতার হাতে খড়ি হয়েছিল কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের প্রখ্যাত পত্রিকা ‘সংবাদ প্রভাকর’এর মাধ্যমে। কলকাতা থেকে প্রকাশিত পত্রিকাটিতে কুমারখালীর ছেলে নিয়মিত লেখা ও সংবাদ পাঠাতে শুরু করেন।  ঈশ্বরগুপ্তের উপদেশ ও সহায়তায় কাঙাল ক্রমশ সাহিত্য রচনা-সাংবাদিকতায় হাত পাকান। এই লেখালেখির প্রেরণা থেকে বাংলাদেশে প্রথম দিককার একটি পত্রিকা ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’ প্রকাশের চিন্তা তাঁর মাথায় আসে এবং তিনি কাজে নেমে পড়েন।
কাঙাল হরিনাথ মজুমদার যখন কুমারখালীতে বেড়ে উঠছিলেন, তখন বৃটিশ শাসিত বাংলায় নীলকর, জোতদার, মহাজনদের প্রতাপ তুঙ্গে। এমনকি পারিবারিক দৈন্যের কারণে নীলকুঠিতে শিক্ষানবীশ হিসাবে চাকরি নিয়ে তিনি খুব কাছ থেকে নীলকরদের অন্যায় অত্যাচার দেখেছিলেন। রায়ত-প্রজার ওপর নীলকর কুঠিয়ালরা কিভাবে অত্যাচার-নির্যাতন করে, তার ভেতর-বাহির বুঝতে কাঙালের বাকি থাকেনি। জোতদার-মহাজনদের অমানুষিক প্রজাপীড়ন ন্যায় ও সত্যের সাধক কাঙালকে ব্যথিত করে তোলে। তিনি চাকরি ছেড়ে দেন। নীলকর- মহানজদের বিরুদ্ধে কলমযোদ্ধা  হিসাবে আবির্ভূত হন। সকল অত্যাচার- নির্যাতনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। সাহসী সাংবাদিক ও সাধক কাঙালের লেখনি বন্ধ করতে না পেরে জমিদার-মহাজনরা তাকে শায়েস্তা করতে  পাঞ্জাবী লাঠিয়াল পর্যন্ত পাঠিয়েছিল। এ সময় বাউল সম্রাট লালন সাঁইয়ের শিষ্য-ভক্তরা  কাঙাল হরিনাথের  নিরাপত্তায় এগিয়ে আসেন।
কাঙাল হরিনাথ আধুনিক মনস্ক স্বাধীনচেতা সাংবাদিক। গ্রামবার্তা প্রকাশিকায় তিনি সাহিত্য, বিজ্ঞান, দর্শনের পাশাপাশি উন্নয়ন ভাবনাও যোগ করেছিলেন। মানবদরদি ও সত্যব্রতী কাঙাল সমাজচিন্তা ও উন্নয়নভাবনার প্রমাণ মেলে কুমারখালীতে বিদ্যালয় স্থাপনের মধ্য দিয়ে। কাঙালের জীবনকে উৎস্বর্গ করেছিলেন সমাজচিন্তা ও মানুষের কল্যাণে। এ জন্য কুমারখালীতে বাংলা স্কুল স্থাপন করে  বিনাবেতনে কাজ শুরু করেন। পশ্চাদপদ নারী সমাজের শিক্ষাদানের জন্য কাঙাল বালিকা বিদ্যালয়ও স্থাপন করেন। সমাজের অন্যায় অসঙ্গতি দূর করে উন্নয়নমুখী সমাজ গঠনের লক্ষ্যে কাঙালের কর্মকুশলে যোগ হয় সাংবাদিকতা ও পত্রিকা সম্পাদনা। দেশের পত্রিকা প্রকাশনায় ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’ যে অগ্রদূতের মতো ভূমিকা রেখেছে তা বলা বাহুল্য।
উনবিংশ শতকের নীলকর-মহাজন-জোতদার-কুঠিয়ালদের দোর্দন্ড প্রতাপ একই আদলে আজ আর কুমারখালীতে নেই। কিন্তু এখনও এই সমাজ থেকে অশিক্ষা, কুশিক্ষা কিংবা অত্যাচার নির্যাতনের খড়গ মুছে যায়নি। আজও জনপদে জনপদে মানুষের মধ্যে রয়েছে উন্নয়নের হাহাকার। রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন নামে সামাজিক শোষণ ও বঞ্চনা। এই প্রেক্ষাপটে আজ কুমাখালী থেকে সাহিত্যিক-সাংবাদিক সোহেল আমিন বাবুর সম্পাদনায় প্রকাশিত হচ্ছে ‘কুমারখালী বার্তা’। গ্রামবার্তা প্রকাশিকা যে প্রেক্ষিতকে সামনে রেখে সাহসী কলম ধরেছিল। আজ কুমারখালী বার্তা’র সামনেও সে প্রেক্ষাপট বর্তমান। নানা বাধা বিপত্তির আর শোষকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে গ্রামবার্তা প্রকাশ হয়েছিল টানা চবিবশ বছর। নানা প্রতিকূলতার ভিড়ে ‘কুমারখালী বার্তা’ টিকে থাকবে, না কি গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে থামিয়ে দেবে সাহসী কলম-এ প্রশ্ন আগ্রহী সুধীজনের। #

Comments