কুমারখালী : প্রসঙ্গ সাহিত্য-সংস্কৃতি



কুমারখালী : প্রসঙ্গ সাহিত্য-সংস্কৃতি



এক.
পঁচিশে বৈশাখ রবীন্দ্রস্মৃতিবিজড়িত শিলাইদহে রবীন্দ্র জন্মজয়নত্মীর উদ্বোধনী বক্তৃতা চলছে সাধারণ শ্রোতা হিসেবে বক্তৃতা শুনছি অন্যতম বক্তা কুমারখালী উপজেলা চেয়ারম্যান জনাব আবদুর রউফ আড়্গেপের সুরে বললেন, কর্ুঠিবাড়ি কুমারখালী উপজেলায় হওয়া সত্ত্বেও অনুষ্ঠানে কুমারখালীবাসীর কর্তৃত্ব তো নেইই, প্রতিনিধিত্ব্ কম এসব আয়োজনের নীতিনির্ধারণে ভবিষ্যতে কুমারখালীর প্রতিনিধিত্ব রাখতে হবে কুমারখালী উপজেলায় এমন বহু ব্যক্তিত্ব আছেন, যাঁরা রকম মঞ্চকে আলোকিত করার যোগ্যতা রাখেন
বলাবাহুল্য মঞ্চে উপবিষ্ট ডজনখানেক ¯^bvgab¨ বক্তার মধ্যে জনাবা সুলতানা তরম্নন জাতীয় সংসদ সদস্য হিসাবে এবং উপজেলা চেয়ারম্যান পদাধিকারবলে মঞ্চে জায়গা পান বাকী আসনগুলো খ্যাতিমান সাহিত্যক, সাংবাদিক, অধ্যাপক প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা পূরণ করেন
¯^bvgab¨ রাজনীতিক জনাব আবদুর রউফের দোষ কী ? তিনি তাঁর রাজনীতিক প্রেড়্গণবিন্দু থেকে নিজ এলাকার প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর বিবেচনায় ড়্গোভ প্রকাশ করেছেন আমি ভাবছিলাম অন্য কথাঃ কুমারখালীর সেই সব তরম্নণরা কোথায়, যাঁরা উপজেলার অতীত-ইতিহাস-ঐতিহ্যের অনুসরণে সাহিত্য-সংস্কৃতির মঞ্চ আলোকিত করবে? কোথায় সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সংস্কৃতির্মী, আবৃত্তিকার-যাদের কর্তৃত্ব থাকবে নিজ এলাকারই বিশ্ব সাহিত্যের স্মৃতিধন্য এরকম একটি অনুষ্ঠানে? কুমারখালীর শিড়্গা, সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চা কি তাহলে হারিয়ে যাচ্ছে ? সবই কি তলিয়ে যাচ্ছে শহুরে ব্যসত্মতার অতল গহ্বরে? অতীতের ইতিহাস কিংবা সত্তর-আশি দশকে আমাদের বেড়ে ওঠার আগে-পরের স্মৃতি স্মরণ করে এসব চিনত্মা এখনও তাড়িয়ে করে ফিরছে

দুই.
বহুদিন পর  গিয়ে দেখলাম কুমারখালী আর সেই শান্ত শহরটি নেই বাজারে টিনের ঘরের জায়গায়  বহুতল দালান উঠেছে ঘটেছে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার মানুষ হয়ে পড়েছে ব্যস্ত-সমস্ত, যান্ত্রিক ঐতিহ্যবাহী পাবলিক লাইব্রেরীকে (১৮৭২ সালের দরিদ্র বান্ধব পাঠাগার, উন্নয়ন মজলিশ, দূর্গাপুর অগ্রগামী পাঠাগারের বিবর্তনের মাধ্যমে যা আজকের পর্যায়ে উন্নীত)  ঘিরে শিড়্গা সংস্কৃতি চর্চার বদলে বাহারী দোকানের পসার পাঠের ঘরে  শিশুবিভাগ আজ আর নেই জনসংখ্যা অনুপাতে পাঠকের সংখ্যা হতাশাজনক সংস্কৃতিচর্চা কেন্দ্রগুলোতে সন্ধ্যার পর  জমাট অন্ধকার আগের মতো গানের সুর বা  তবলার বোল ওঠে না ভরমৌসুমেও স্পোর্ট ক্লাব কর্তৃক আয়োজন নেই কোন খেলার গড়াইবিধৌত কুমারখালীর বাঁধে প্রশানত্ম বিকাল বা শান্ত সন্ধ্যায় হাওয়া খাওয়া-সূর্যাস্ত দেখার লোকেরও আজ বড় অভাব যে চর্চা মানুষের হৃদয়কে জাগায়, বড় করে তোলে, তার দেখা পাওয়া ভার এখন কুমারখালীতে সবকিছুই যেন জীবিকার তাগিদময়

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাঙাল হরিনাথ, বাউলসম্রাট লালন, মীর মশাররফ, জলধর সেন,অধ্যড়্গ হেরম্ব মৈত্র, গোঁসাই গোপাল, প্রফুলস্ন কুমার সরকার, অড়্গয়কুমার মৈত্রেয়, দীনেন্দ্র রায়, শিবচন্দ্র বিদ্যার্ণব, ভোলানাথ মজুমদার, গোলাম রহমান পন্ডিতরা সাহিত্য-সংস্কৃতি-সাংবাদিকতার জন্য যে প্রাণানত্মকর পরিশ্রম করেছেন কিংবা পরবর্তীকালে এই নৌকার হাল ধরে বিষ্ণুপদ বিশ্বাস, বসনত্মকুমার পাল, মোহিত রায়, শওকত আলী, শচীন্দ্রনাথ অধিকারী, মাহতাবউদ্দিন ওয়ালী, আকবর হোসেন, জোবেদা খানম, নাজমুল আলম, মাসুদ করিম, গীতিকার আবু জাফর যে কাজে আত্মনিয়োগ করেন, মানসচর্চার এই ড়্গেত্রটিতে প্রত্যাশিত জোয়ারের বদলে আজ ভাটার টান
সত্তর-আশির দশকে আমাদের বেড়ে ওঠার সময়ও কুমারখালীর সাহিত্য সংস্কৃতিতে জোয়ার ছিল উল্লেখ করার মতো তখনকার  তরম্নণরা ভাল করেই বুঝে নেয় যে, যে উপজেলা সাহিত্য-সংস্কৃতির কারণে বিশ্বনন্দিত, সেই সাহিত্য-সংস্কৃতি উপেড়্গা করে বড় হওয়ার  কোন পথ নেই ঐতিহ্যের উত্তরসূরী হিসাবে কুমারখালীতে অধ্যাপক মিলি রহমান, জেড ভি দেওয়ান, খন্দকার আবদুল হালিম, শামসুর রহমান, সুকুমার দাশ, ওয়াহেদ পান্না, অশোক মজুমদার, অশোক কুমার সাহা, কাজী আখতার হোসেন,মীর আরশেদ আলী, মরহুম মীর আমজাদ আলী, এম রাজ্জাক, আবু তৈয়ব পচু, কে এম মনসুর উল আলম, আলতাফ হোসেন কিরণ,  এম রফিক, এম আবদুল্লাহ,  মীর আশরাফ আলী, আবদুল গাফফার বিশ্বাস, জাহাঙ্গীর আলম, শিবনাথ কর্ম্মকার, অজয় বিশ্বাস, আফজাল হোসেন, মাহমুদ হোসেন মানু, মীর মূর্ত্তজা আলী বাবু, বিলু কবীর, সোনাউদ্দৌলা সোনা, শাহ আলম চুন্নু, জহিরুল আজাদ, কে এম আলম টমে, সোহেল আমিন বাবু, বকুল চৌধুরী, বাবলূ জোয়ার্দ্দার, রাতুল দাশ, নিহাল আনোয়ার, অশোক দাশ, লিটন আব্বাস, মাহবুবা খোন্দকার, সঞ্জয় চাকী এবং এই নিবন্ধকার সাহিত্য-সংস্কৃতি-সাংবাদিকতা নানা সংগঠনের কর্মপ্রয়াস এগিয়ে নিয়ে যান নানা সময়ে সাহিত্য-সংস্কৃতি-সাংগঠনিক চর্চার পৃষ্ঠপোষক হিসাবে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক শহীদ গোলাম কিবরিয়া,  নুরে আলম জিকু, আবদুল কুদ্দুস বিশ্বাস, আবুল হোসেন তরুণ, আলাউদ্দিন আহমেদ, ইসহাক আলী মালিথা, গোলাম মোস্তফা মালিথা, নূরুল ইসলাম প্রামাণিক,  এম  হান্নান সহ অনেকের ভূমিকা ছিল তুলনাহীন  
এখন আর সেদিন নেই এখন সুকুমার দাশ এর কুমারখালী মেডিক্যাল হলে মিলি রহমান, কাজী আখতার হোসেনদের আড্ডা বসে না বসে না গরম সিঙ্গারার সঙ্গে নিয়মিত সাহিত্যসভা মীর মূর্ত্তজা আলী বাবুদের পারিবারিক বইয়ের দোকান কিশলয়কে ঘিরে তরম্নণ সাহিত্য-সংস্কৃতি-নাট্যকর্মীদের যে তৎপরতা চলতো, তার দেখা পাওয়া ভার অশোক  মজুমদারের কাঙাল কূটির প্রেসে লিটল ম্যাগাজিন ছাপতে ভিড় করে না কেউ পাবলিক লাইব্রেরী মিলনায়তনে অনুষ্ঠান বলতে কিছু নেই খোকসা জানিপুর থেকে অধ্যাপক রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাসের মতো কেউ ছুটে আসেন না সদ্য লেখা প্রবন্ধ হাতে এম রাজ্জাক বিএ মতো এলাকার সমস্যা নিরসন কিংবা সম্ভাবনা তুলে ধরে দৌড়াদৌড়ি করার মতো gd¯^j সাংবাদিকের বড় অভাব অভাব খন্দকার আবদুল হালিমের মতো নিভৃতচারী সাহিত্যিক ইতিহাসবিদের অনলবর্ষী বক্তা ওয়াহেদ পান্না, মুক্তিযোদ্ধা রেজাউল করিম হান্নানরা জীবনযুদ্ধে ক্লান্ত মীর আমজাদ আলী আজ প্রয়াত।  আলতাফ হোসেন কিরণ, নুরুল ইসলাম প্রামাণিক, এম রফিক, কে এম আলম টমে, মাহমুদ হোসেন মানু, সোনাউদ্দৌলা সোনা, অজয় বিশ্বাস, শামসুজ্জামান অরুণ, শাজাহান বিশ্বাসের মতো সংগঠকের দেখা মেলা  ভার সাংগঠনিক কর্মকান্ডে চাটুকারিতা, আত্মম্ভরিতা আর  নানা অসৎ-অশুভ কাজ আজ জায়গা দখল করেছে উত্তরণমুখী মানসচর্চাকে এই প্রবণতা বড় দুঃখজনক
তিন.
এতোসব হতাশা আর নেতিবাচক অবস্থার মধ্যে বন্ধুবর সাহিত্যিক সাংবাদিক সোহেল আমিন বাবু এগিয়ে এসেছেন নতুন বার্তা নিয়ে  বৃটিশ-বাংলায় অকুতোভয় সাংবাদিক কাঙাল হরিনাথ মজুমদার কুমারখালী থেকে গ্রামবার্তা প্রকাশিকা সাময়িকী প্রকাশ করে শাসক-শোষকদের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিলেন শতবর্ষের আগের সেই ধারাবাহিকতার পথে পা বাড়িয়েছেন বাবু তাঁর এই পত্রিকাকে কেন্দ্র করে কুমারখালীতে লেখক-সাংবাদিকদের একটি গ্রম্নপ গড়ে উঠতে শুরম্ন করেছে সমাজের নানা দুর্নীতি, অসঙ্গতি- অসত্যের সয়লাবের মধ্যে সৎ নিষ্ঠায় অটল থেকে তারা কতোটা দায়িত্ব পালন  করতে পারছে তা বিচারের সময় এখন নয় তবে যে কাজ শুরম্ন হয়েছে, তা সমাজকে আলোকিত করার কাজ সকল নেতিবাচকতাকে পায়ে দলে এগিয়ে যাওয়ার ড়্গেত্রে তরম্নণ সমাজকে জাগিয়ে তোলার কাজ
আলো আসলে অন্ধকার পালিয়ে যায় কাজী মিয়াজান, মুন্সী মেহেরউলস্নাহ, বাঘাযতীনদের ঐতিহ্যবাহী কুমারখালীর ঐতিহ্য  অটুট রাখতে মানুষকে আলোকিত করার যে কাজ শুরম্ন করেছেন বাবু একা, তাকে টিকে রাখার দায়িত্ব এখন সকলের #


লেখক: সাহিত্যিক-সাংবাদিক-টিভি উপস্থাপক


Comments

  1. হাফিজ ভাই ধন্যবাদ....কুমারখালীকে নিয়ে অনেকদিন পর এরকম লেখার জন্য. আরো বিস্তারিত আরো বড় করে লেখা দরকার। .....সঞ্জয় চাকী

    ReplyDelete

Post a Comment